স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হাম রোগের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালটিতে এখন হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১৪৯ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে।
শনিবার দুপুরে হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি জানান, শুক্রবার দুপুর থেকে শনিবার দুপুর পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে এই তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
এই সময়ের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ২৫ জন ভর্তি হয়েছে। আর সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে তিন শিশু। হাসপাতালটিতে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ৩৭৭ জন। আর চিকিৎসাধীন অবস্থায় এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৩৮ জন শিশু
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় জানিয়েছে, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত ৫২০টি নমুনা পরীক্ষা করা হলে ১৪৩ জনের শরীরে হামের উপস্থিতি পাওয়া যায়। এতে সংক্রমণের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, হামের সংক্রমণ শুধু শিশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে ৬ মাসের কম বয়সী শিশুরা, যাদের অধিকাংশ এখনও টিকার আওতায় আসেনি। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৬৫ শতাংশই ৯ মাসের আগেই সংক্রমিত হচ্ছে। সরকার আগামী ৫ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী টিকাদান কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। রাজশাহীতে নতুন টিকা না আসলেও পূর্বে মজুদ থাকা ৩৮ হাজার ৫৯০ ডোজ দিয়ে কার্যক্রম শুরু হবে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৯ মাস বয়সে ৫৬,৪৯০ জন এবং ১৫ মাসে ৫৫,৫০৩ জন শিশু টিকা পেয়েছে। ২০২৫ সালে সংখ্যা বেড়ে যথাক্রমে ৫৯,২৫৯ এবং ৫৮,৩০২ জনে দাঁড়ায়।
সরেজমিনে রামেক হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, শিশু ওয়ার্ডে রোগীর চাপ তীব্র। শয্যা সংকটের কারণে অনেক অভিভাবক মেঝেতে বসে সন্তানদের চিকিৎসা করাচ্ছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর ও নওগাঁ থেকে আসা অভিভাবকরা জানান, শুরুতে সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলা করলেও পরে হামের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে আসতে হয়েছে। রাজশাহীতে নগর ও গ্রামাঞ্চল জুড়ে অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, একাধিক রোগী শনাক্ত এলাকা আউটব্রেক হিসেবে বিবেচনা করে সেখানে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। টিকা প্রয়োগের মাধ্যমে সংক্রমণ কমানো সম্ভব হলে শিশুদের ঝুঁকিও কমে আসবে।
হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস জানান, ৪০ শয্যার একটি হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। শিশু ওয়ার্ড ও মেডিসিন বিভাগে আলাদা আইসোলেশন কর্নার রাখা হয়েছে। রোগীর চাপ বেড়ে গেলে একটি শিশু ওয়ার্ডকে পুরোপুরি আইসোলেশন ইউনিটে রূপান্তর করা হবে। বর্তমানে হাসপাতালে ১৪৯ শিশু চিকিৎসাধীন। শিশুদের জন্য পিআইসিইউ শয্যা ১২ থেকে বাড়িয়ে ১৮টি করা হয়েছে, যার মধ্যে ১২টি শয্যা হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য। গুরুতর রোগীদের চিকিৎসায় বিকল্প হিসেবে হার্ট ফাউন্ডেশনেও পাঠানো হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘৬ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বেশি। তাই অভিভাবকদের আরও সতর্ক থাকতে হবে। হাসপাতালের সব সন্দেহভাজন রোগীকে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা হচ্ছে। নিশ্চিতভাবে হাম কি না তা পরীক্ষা করা সময়সাপেক্ষ, তবে আমরা চেষ্টা করছি।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ বা পজিটিভ হিসেবে ২২৯ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছেন। স্বাস্থ্য বিভাগ ২৬টি এলাকা প্রাদুর্ভাব এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সর্বোচ্চ সংক্রমণ দেখা গেছে পাবনায় (১০টি এলাকা), রাজশাহীতে ছয়টি এলাকা (যার পাঁচটি মহানগরের ভেতরে), নওগাঁয় পাঁচটি, চাঁপাইনবাবগঞ্জে তিনটি, নাটোর ও সিরাজগঞ্জে একটি করে এলাকা। স্বাস্থ্য বিভাগ আশঙ্কা করছে, পর্যাপ্ত পদক্ষেপ না নিলে আক্রান্ত এলাকা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
