নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

বাংলাদেশ শুক্রবার। রাত ৯:৫৮। ৫ জুন, ২০২৬।

বিষে হারানো নীরব প্রাণের শোকমিছিল ও স্মরণসভা অনুষ্ঠিত

জুন ৫, ২০২৬ ৬:৫৭ 👁️ ২২ views
Link Copied!

স্টাফ রিপোর্টার : বিষে হারানো নীরব প্রানের শোকমিছিল ও স্বরণ সভা শীর্ষক একটি ব্যতিক্রমধর্মী কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। কীটনাশকের কারণে ক্রমশ হারিয়ে যাওয়া মাটির প্রাণ-অণুজীব, মৌমাছি, প্রজাপতি, পাখি, ব্যাঙ, মাছ, কেঁচো এবং উদ্ভিদসহ অন্যান্য উপকারী প্রাণবৈচিত্র্যের স্মরণে এ আয়োজন করা হয়।

শুক্রবার(৫ জুন) বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে রাজশাহীর পবা উপজেলার বড়গাছি স্কুলপাড়া গ্রামে শতবর্ষী আমগাছের ছায়াতলে “বিষে হারানো নীরব প্রাণের শোকমিছিল ও স্মরণসভা” শীর্ষক এক ব্যতিক্রমধর্মী পরিবেশ সচেতনতামূলক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক (BARCIK), বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম এবং গ্রিন কোয়ালিশন-রাজশাহীর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে কীটনাশকের কারণে ক্রমশ হারিয়ে যাওয়া মাটির অণুজীব, মৌমাছি, প্রজাপতি, পাখি, ব্যাঙ, মাছ, কেঁচো, উদ্ভিদসহ বিভিন্ন উপকারী প্রাণবৈচিত্র্যের স্মরণে শোক প্রকাশ করা হয়।

অনুষ্ঠানের শুরুতে অংশগ্রহণকারীরা “বিষে হারানো নীরব প্রাণের শোকমিছিল” এ অংশ নেন। কৃষক-কৃষাণী, যুব, শিক্ষক, কবি-সাহিত্যিক, পরিবেশকর্মী এবং স্থানীয় জনগোষ্টী শোকমিছিলে অংশগ্রহণ করে “প্রাণ বাঁচলে প্রকৃতি বাঁচবে”, “বিষ নয়, জীবন চাই”, “প্রাণণবৈচিত্র্য বাঁচাও, খাদ্য বাঁচাও”, “মাটি বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও” ইত্যাদি শ্লোগান দেন। পরে কীটনাশকে ক্ষতিগ্রস্ত ও হারিয়ে যাওয়া প্রাণণবৈচিত্র্যে স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এর পর বট পাইকড় গাছ বৃক্ষরোপন করা হয়।

নীরবতা শেষে অনুষ্ঠিত হয় এক ব্যতিক্রমধর্মী প্রকৃতি-ভিত্তিক নাট্যরূপ বা ইকো-থিয়েটার (Eco-theatre)। এতে ২৪ জন অংশগ্রহণকারী প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান ও প্রাণবৈচিত্র্যের প্রতীকী চরিত্র ধারণ করে তাদের জবানবন্দি উপস্থাপন করেন। মৌপতঙ্গ, গাছ ও বন, জোনাকি, নদী, মাটি, কৃষিজমি, দেশীয় বীজ, কেঁচো, পাখি, প্রজাপতি, ব্যাঙ, দেশীয় মাছ, বৃষ্টির পানি, জলাভূমি, বাতাস, ভূগর্ভস্থ পানি, মাটির অণুজীব, কৃষক-কৃষাণী, বরেন্দ্র অঞ্চল এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতিনিধিরা কীটনাশক, দূষণ ও পরিবেশ ধ্বংসের ফলে তাদের অস্তিত্বের সংকট এবং মানবজীবনের ওপর এর প্রভাব তুলে ধরেন একক অভিনয়ের মাধ্যমে।

আরও পড়ুনঃ  সাংবাদিকদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে না সরকার : তথ্য প্রতিমন্ত্রী

নদীর চরিত্রে অভিনয় করে তামিম তুলি বলেন, “আমি শুধু পানি নই; আমি ইতিহাস, সভ্যতা ও জীবনের ধারক। নদী যখন মরে যায়, তখন শুধু পানি হারায় না; হারিয়ে যায় মাছ, কৃষি, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবন-জীবিকা। নদী বাঁচলে মানুষ বাঁচবে, নদী মরলে সভ্যতাও একদিন শুকিয়ে যাবে।”

মাটির চরিত্রে সোহেল রানা বলেন, “রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অবাধ ব্যবহারে আমার ভেতরের অগণিত অণুজীব ধ্বংস হচ্ছে। মাটি অসুস্থ হলে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থাও অসুস্থ হয়ে পড়ে।”

প্রজাপতির চরিত্রে উম্মে ফাতেমা তুয জোহরা বলেন, “আমাদের হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি সুন্দর প্রাণীর বিলুপ্তি নয়; এটি পরাগায়ন ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের সংকেতবাহী এক বড় বিপর্যয়।”

ব্যাঙের চরিত্রে রবিউল হাসান মিন্টু বলেন, “আমি কৃষকের বন্ধু। প্রতিদিন অসংখ্য ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফসল রক্ষা করি। অথচ বিষাক্ত কীটনাশকের কারণে আজ আমার অস্তিত্বই হুমকির মুখে।” ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী রাশেদ খান মিলন বলেন, “আজকের পরিবেশ ধ্বংসের দায় আমরা বহন করব। নিরাপদ পৃথিবী, বিশুদ্ধ পানি ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ পরিবেশ আমাদের অধিকার।”

আরও পড়ুনঃ  চাইলেই ইরানের ইউরেনিয়াম দখল করতে পারি : ট্রাম্প

একক নাট্যাভিনয়ের সকলের পক্ষে উকালতি সমাপনী যুক্তি উপস্থাপন করেন ‘প্রকৃতির আইনজীবী’ চরিত্রে মো. আতিকুর রহমান। তিনি বলেন, “প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। পরিবেশ ধ্বংসের মাধ্যমে আমরা নিজেদের ভবিষ্যৎকেই বিপন্ন করছি। পরিবেশ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাছাড়া পরিবেশসহ সকল প্রাণের সুস্থ ও সুন্দরভবে বেঁচে থাকার অধিকার আছে।”

পরে ঐতিহাসিক ঘোষণা পাঠ করেন বারসিকের গবেষক ও আঞ্চলিক সমন্বয়ক শহিদুল ইসলাম। ঘোষণায় প্রাণবৈত্র্যি সংরক্ষণ, পরিবেশবান্ধব কৃষি, নদী ও জলাভূমি রক্ষা, রাসায়নিক নির্ভরতা হ্রাস এবং পরিবেশ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ইউসেপ বাংলাদেশের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মো. শাহিনুল ইসলাম, বড়গাছি ঈদগাহ মাঠ কমিটির সভাপতি ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. মাহমুদুল হক এবং রাজশাহী কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জুয়েল কিবরিয়া।

বক্তারা বলেন, প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণী ও উপাদান পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। কৃষিতে অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মৌমাছি, প্রজাপতি, পাখি, ব্যাঙ, মাছ, কেঁচো এবং মাটির অণুজীবসহ অসংখ্য উপকারী প্রাণবৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, কৃষকের স্বাস্থ্য এবং পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে কীটনাশক নির্ভরতা কমিয়ে এগ্রোইকোলজি ও পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে হবে।

আরও পড়ুনঃ  নিয়ামতপুরে ২০০ লিটার চোলাই মদসহ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে গ্রিন কোয়ালিশন পবা উপজেলা শাখার সভাপতি রহিমা খাতুনের নেতৃত্বে অংশগ্রহণকারীরা “পৃথিবী রক্ষার সম্মিলিত প্রতিশ্রæতি” শীর্ষক শপথ পাঠ করেন। শপথে অংশগ্রহণকারীরা ঘোষণা করেন -“আমরা শপথ করছি, আমরা নদ-নদী রক্ষা করব। আমরা মাটি ও কৃষিজমি রক্ষা করব। আমরা গাছ ও বন রক্ষা করব। আমরা মৌপতঙ্গ রক্ষা করব। আমরা পুকুর, জলাশয় ও জলাভূমি রক্ষা করব। আমরা ক্ষতিকর কীটনাশক ও রাসায়নিক ব্যবহারে সর্বদা নিরুৎসাহিত করব। পরিবেশবান্ধব কৃষিচর্চা ও পরিবেশ ন্যায়বিচার নিশ্চিতে কাজ করব। আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখব। আমরা আর প্রকৃতিকে শোষণ করব না; আমরা প্রকৃতিকে সম্মান করব। আমরা উন্নয়ন করব, কিন্তু জীবনের বিনিময়ে নয়। পৃথিবী আমাদের নয়, আমরা পৃথিবীর অংশ।”

কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী কৃষক, শিক্ষার্থী, পরিবেশকর্মী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং বিষমুক্ত কৃষি ব্যবস্থার এগ্রোইকোলজিরর প্রসারের পক্ষে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। আয়োজকরা বলেন, পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষার লড়াই শুধু প্রাকৃতিকে বাঁচানোর জন্য নয়, বরং মানুষের অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার জন্যও অপরিহার্য।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে রাজশাহীর বড়গাছি স্কুলপাড়া গ্রামে শতবর্ষী আমগাছের ছায়াতলে “বিষে হারানো নীরব প্রাণের শোকমিছিল ও স্মরণসভা” শীর্ষক এক ব্যতিক্রমধর্মী পরিবেশ সচেতনতামূলক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে।

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল সময়ের কথা ২৪ লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন somoyerkotha24news@gmail.com ঠিকানায়।