স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহীর দুর্গাপুরে ‘সাংবাদিক সমাজের উন্নয়নে’ পুকুর খনন করতে দেওয়ার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। আর এই আবেদনে সুপারিশ করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মণ্ডল।
আবেদনের এই কপি ছড়িয়ে পড়লে সাংবাদিকদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। রাজশাহীর পেশাদার সাংবাদিকরা বলছেন, কাউকে পুকুর খনন করতে দেওয়ার জন্য আবেদন করা সাংবাদিকদের কাজ নয়। প্রশাসনকে ব্যবহার করে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণই এর উদ্দেশ্য।
আইন অনুযায়ী, জমির শ্রেণি পরিবর্তন নিষিদ্ধ। কিন্তু দীর্ঘ দিন ধরেই দুর্গাপুরের মাঠে মাঠে চলছে পুকুর খননের মহাযজ্ঞ। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় পুলিশ, প্রশাসন ও এক শ্রেণির গণমাধ্যমকর্মীদের ম্যানেজ করে ভূমি খেকো চক্র কৃষকের জমি জোর করে দখল করে পুকুর কাটছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুর্গাপুরে পুকুর সিন্ডিকেটের টাকায় সরকারি জমিতে দোতলা প্রেসক্লাব ভবনও গড়ে তোলা হয়েছে। পুকুরের টাকায় এক শ্রেণির গণমাধ্যমকর্মীও আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে আগের সাংবাদিকরা প্রেসক্লাবের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন।
এখন দুর্গাপুর প্রেসক্লাব ও সাংবাদিক সমাজের সভাপতি কোরবান আলী। আর সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বাবলু। তারাই মুশিফিকুর রহমান ও কামাল হোসেন নামের দুই ব্যক্তিকে দুটি মৌজায় ১৭ বিঘা জমিতে পুকুর খনন করতে দেওয়ার জন্য গত বুধবার (৬ মে) ইউএনওর কাছে আবেদন করেছেন।
লিখিত আবেদনে বলা হয়েছে, ‘আমরা অবগত আছি যে, দুর্গাপুর উপজেলাধীন ৭ নম্বর জয়নগর ইউনিয়নের অন্তর্গত পরিলা এবং জয়নগর মৌজায় অনাবাদী পতিত জমি রয়েছে, যা স্থানীয় সাধারণ কৃষকদের কাছ থেকে মুশফিকুর রহমান ও কামাল হোসেন লিজ গ্রহণ করেছেন। পতিত জমিগুলো পুকুর হিসেবে খনন করা হলে এলাকার পরিবেশ উন্নয়ন, মাছ চাষের সুযোগ সৃষ্টি এবং স্থানীয় জনগণ ও সাংবাদিক সমাজের সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
এই আবেদনে রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনের এমপি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মন্ডল সুপারিশ করে লিখেছেন, ‘বিষয়টি তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করা হলো।’
বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে এমপি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মন্ডলকে একাধিকবার ফোন করা হলেও ধরেননি। তাঁর ছেলে ব্যারিস্টার আবু বকর সিদ্দিক রাজন বলেন, ‘আমরা কিন্তু এলাকায় পুকুর খনন বন্ধ করেছি। এখন কোনো পুকুর খনন হয় না। আর এ জন্যই আবেদন আসছে। এমপির কাছে সুপারিশের জন্য আসছে। তিনি কিন্তু তদন্ত সাপেক্ষে দেখতে বলেছেন। তদন্তে পুকুর খনন উপযোগী মনে হলে ইউএনও দেবেন। তা না হলে না।’
এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুর্গাপুর প্রেসক্লাব ও সাংবাদিক সমাজের একটিই কার্যালয়। গণঅভ্যুত্থানের আগে পুকুর সিন্ডিকেটের টাকায় দোতলা এই ভবনটি নির্মিত হয়েছে। আগে দুর্গাপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি ছিলেন রবিউল ইসলাম রবি। আর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন গোলাম রসুল। সাংবাদিক সমাজের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে মোবারক হোসেন শিশির ও মিজানুর রহমান। তারা দুর্গাপুরের মূলধারার গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে পরিচিত।
গণঅভ্যুত্থানের পর প্রেসক্লাব ভবনটিতে তালা দেন কোরবান আলী ও জাকির হোসেন বাবলু নামের দুই ব্যক্তি। এখন কোরবান দুই সংগঠনের সভাপতি, বাবলু সাধারণ সম্পাদক। আগের কোনো সাংবাদিক এখন আর এই প্রেসক্লাব ও সাংবাদিক সমাজের কার্যালয়ে যেতে পারেন না।
বর্তমান সভাপতি কোরবান একসময় পৌরসভার পিয়ন পদে অস্থায়ীভিত্তিতে চাকরি করতেন। সেই চাকরি ছেড়ে তিনি আইনে পড়াশোনা করেন। তখন তিনি এলাকায় সাংবাদিক হিসেবেও পরিচয় দেওয়া শুরু করেন। দৈনিক ক্রাইম নিউজ নামের একটি অনিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টালের সম্পাদক ও প্রকাশক তিনি। ২০২৫ সালে প্রায় ৪১ বছর বয়সে বার কাউন্সিলের পরীক্ষা দিতে গিয়ে অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতে তার কারাদণ্ড হয়।
প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক বাবলু দুর্গাপুর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক সভাপতি। তিনি স্যানিটারি ও ইলেকট্রিক মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করেন। ৫ আগস্টের পরে তিনি অগ্রযাত্রা প্রতিদিন নামের একটি গণমাধ্যমের সাংবাদিক হয়ে যান। আগে পড়াশোনা করেননি বাবলু। কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে ৩৬ বছর বয়সে এ বছর তিনি এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন।
পুকুর খননের জন্য এই আবেদন করার কথা স্বীকার করেছেন বাবলু। পুকুর খনন করলে সাংবাদিক সমাজের কী উন্নয়ন হবে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সব সাংবাদিক সমাজের না। দুর্গাপুরের সাংবাদিক সমাজের উন্নয়ন হবে।’ বাবলু স্বীকার করেন, তিনি এখনও স্যানিটারি ও ইলেকট্রিক মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করেন এবং এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন।
এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘আপনি সাংবাদিক কি না, সেটা আমি জানি না। তাই মোবাইলে আমি কোনো কথা বলতে পারব না। সামনাসামনি আসতে হবে। তখন কথা হবে।’
সভাপতি কোরবান আলী বলেন, ‘আমাদের প্রেসক্লাবের ভবনটা আছে, কিন্তু দরজা-জানালা নাই। ভালো টয়লেট নাই। পুকুর দুটি খনন করা গেলে আমরা এসব করতে পারব।’
রাজশাহী প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা মামুন বলেন, ‘কাউকে পুকুর খনন করতে দেওয়ার জন্য প্রশাসনের কাছে আবেদন করা সাংবাদিক সমাজের কাজ না। আমি আবেদনটির কপি দেখেছি। স্থানীয় এমপি সুপারিশ করেছেন। তাঁরও এটা উচিত হয়নি। তিনি ইউএনওকে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছেন। এখন ইউএনও যদি অনুমতি দেন তাহলে দায়ভার তার। আর এ বিষয়টি সাংবাদিকদের পেশার সঙ্গে যায় না।’
আইনে নিষিদ্ধ হলেও মাঠে মাঠে পুকুর খননের বিরুদ্ধে সোচ্চার রয়েছেন রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান। তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকদের আয়ের উৎস না থাকলে এমপি সাহেব অন্যভাবে করে দিতে পারেন। কিন্তু পুকুর কেটে এটা করতে পারেন না। যদি এমপি ও ইউএনও এই উদ্যোগ নেন তাহলে ঠিক হবে না। কারণ, তারাই আইনের রক্ষক। আইন ভঙ্গ করলে হবে না। এতে পরিবেশ নষ্ট হবে। কৃষিজমি নষ্ট হবে।’
দুর্গাপুরের ইউএনও মাশতুরা আমিনা বলেন, ‘যারা জমির মালিক তারা কিন্তু আবেদন করেননি। দুজন ইজারা গ্রহণ করেছেন উল্লেখ করে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছে। তারা এই আবেদন করতে পারেন না। পতিত জমি উল্লেখ করে তারা পুকুর খনন করতে দেওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। তবে পুকুর খনন করতে দেওয়ার সুযোগ নেই।’
