স্টাফ রিপোর্টার : অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ও অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে। দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের মানুষ বাজেটে তাদের ইচ্ছার প্রতিফলন থেকে বঞ্চিত ছিল। গত ১২ই ফেব্রুয়ারির একটি ঐতিহাসিক ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সম্মতিতে গঠিত এই নতুন সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী।
শুক্রবার (১২ জুন) মন্ত্রী রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের লুণ্ঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে দেওয়ার ফলে অর্থনীতি একটি ভঙ্গুর অবস্থায় চলে এসেছিল। এই সীমিত সম্পদের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও প্রতিটি নাগরিক, বিশেষ করে যারা এতদিন অর্থনৈতিক ভাবনার বাইরে বা প্রান্তিক পর্যায়ে ছিলেন, তাদের সবাইকে বাজেটের আওতায় এনে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। এটি কেবল বরাদ্দের প্রথাগত বাজেট নয়, বরং একটি সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক রোডম্যাপ।অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, এখন থেকে সরকারি অর্থের অপচয় রোধ করতে এবং প্রতিটি প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ৪টি মৌলিক বিষয় যথা: অর্থের সঠিক মূল্যায়ন; বিনিয়োগের বিপরীতে যথাযথ প্রাপ্তি; কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পরিবেশগত সুরক্ষা ও জলবায়ু বিবেচনা এর ওপর ভিত্তি করে ব্যয় নির্ধারণ ও অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের ধাক্কা সামলানোর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমিয়ে আনা হচ্ছে। লাইসেন্সিং ও কোম্পানি রেজিস্ট্রেশনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস করে ৭ দিনের মধ্যে সেবা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। এছাড়া মন্ত্রী বলেন, পুলিশ বা র্যাব দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণের সনাতন পদ্ধতির চেয়ে সঠিক নীতি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। একই সাথে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘ ১১ বছর যাবত পে-স্কেল না হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে বেতন বৃদ্ধির মাধ্যমে দুর্নীতি কমানোর প্রাকৃতিক প্রবণতা তৈরি করা হচ্ছে।
মন্ত্রী বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে মূল অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আইসিটি শিল্প এবং কৃষি খাতে সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত কর্মসংস্থানের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। তরুণ সমাজ ও স্টার্টআপ কমিউনিটিকে প্রপার সাপোর্ট দিয়ে বাংলাদেশকে পরবর্তী গ্লোবাল টেকনোলজি ও ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কাঁচামালের ওপর জিরো পার্সেন্ট ট্যাক্স ইমপ্যাক্ট ও মডেল ওয়ারহাউস সুবিধা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গ্রামীণ কামার, কুমার, তাঁতি, শাতলপাটি কারিগর, লোকশিল্পী ও থিয়েটার আর্টিস্টদের অর্থনৈতিক মূলধারায় আনতে ক্রিয়েটিভ ইকোনমি ধারণার প্রবর্তন করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দের মাধ্যমে এই সফট পাওয়ারকে মনিটাইজ করার এবং বিশ্ববাজারে Amazon, eBay কে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আমির খসরু বলেন, সামাজিক সুরক্ষায় এবার দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ করা হয়েছে। ৪১ লক্ষ নারীদের ফ্যামিলি কার্ড, মিশন কার্ড এবং ইউনিভার্সাল হেলথকেয়ারের মতো সিগনেচার প্রকল্পগুলো সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে সরকারি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে শতভাগ স্বচ্ছতার ভিত্তিতে বণ্টন করা হচ্ছে।
বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে যে সমালোচনা উঠেছে, তা নাকচ করে অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, এবার তেমন কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। মূলত জমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে প্রকৃত মূল্য গোপন করার যে প্রবণতা ছিল, তা দূর করতে এবং আইনি চ্যানেলে অর্থের বিবরণী আনার জন্য একটি বিশেষ ট্যাক্স রেট ও ডিক্লেয়ারেশনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সারা দেশে মৌজাভিত্তিক রিয়েল মার্কেট ভ্যালু নির্ধারণের জন্য জরিপ কাজ চলছে।
ব্যাংকিং খাতে বিগত সরকারের সময় এক-তৃতীয়াংশ ডিপোজিট চুরি হয়ে গেছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী দেশের নাগরিকদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। সোশ্যাল মিডিয়ায় ইসলামী ব্যাংক ও অন্যান্য ব্যাংক নিয়ে ছড়ানো গুজবে কান না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব টুলস ব্যবহার করে ব্যাংকগুলোকে স্থিতিশীল করা হচ্ছে। আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে দীর্ঘ ১২ বছর ধরে আটকে থাকা গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে। এছাড়া, পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে একটি স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্স’ গঠন করা হয়েছে, যা ১০টি আন্তর্জাতিক এজেন্সির সাথে যৌথভাবে কাজ করছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশে পাচার করা অর্থ ফ্রিজ করা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে এবং নগদ টাকার ওপর নির্ভরতা কমাতে আগামী মাসের ১ তারিখ থেকে সর্বস্তরে বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকট প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ৫৬,০০০ কোটি টাকার বকেয়া বিল পরিশোধের বিশাল চাপ সত্ত্বেও দেশে জ্বালানি ও তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হয়েছে। সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। পূর্ববর্তী সরকারের একতরফা চুক্তির কারণে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বাতিলের আইনি জটিলতা থাকলেও আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতের ভিত্তিতে এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের শর্ত ও পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স বজায় রাখতে ২০৩০ সালের মধ্যে ৫,০০০ মেগাওয়াট ব্যাটারি-বেসড সোলার পাওয়ার অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার কারণে সোলার প্যানেল ও ব্যাটারির শুল্ক শূন্য করা হয়েছে।
রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, এনবিআর-এর পলিসি ও অপারেশন শাখাকে সম্পূর্ণ আলাদা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। খুচরা দোকান, পার্ক ও রেস্টুরেন্টগুলোকে ফ্ল্যাট রেট ট্যাক্সের আওতায় আনা হচ্ছে। সম্পূর্ণ এনবিআর ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজড ও ট্রান্সপারেন্ট করার মাধ্যমে দুর্নীতি বন্ধ ও কর আদায়ের দক্ষতা বৃদ্ধি করা হবে। একই সাথে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি রোধ করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে সরাসরি ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড এর মাধ্যমে সার্বক্ষণিক মনিটরিং নিশ্চিত করা হবে। সরকার আগামী দুই বছরের মধ্যে এই সুনির্দিষ্ট কৌশলের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে একটি মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে পরবর্তী বছরগুলোতে সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাবে বলে অর্থমন্ত্রী দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী হলেন জহির উদ্দিন স্বপন, শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, মাহ্দী আমিনসহ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীগণ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবগণ, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন।
#
