নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

বাংলাদেশ

দলীয় রাজনীতি ও সাংবাদিকতা: স্বার্থের সংঘাতে বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট

জুলাই ২৫, ২০২৬ ১০:৩৪ 👁️ ৪৮ views
Link Copied!

মুহা: আব্দুল আউয়াল : গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও বিশ্বাসযোগ্য সাংবাদিকতা। রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের কর্মকাণ্ডের ওপর জনস্বার্থের দৃষ্টিতে নজরদারি করা, তথ্য যাচাই করে সত্য তুলে ধরা এবং জনগণকে সচেতন ও তথ্যসমৃদ্ধ করে তোলাই সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব। অন্যদিকে রাজনীতি হলো রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জন, পরিচালনা ও নীতিনির্ধারণের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত একটি প্রক্রিয়া। রাজনীতির লক্ষ্য একটি নির্দিষ্ট আদর্শ, কর্মসূচি বা দলের পক্ষে জনসমর্থন সৃষ্টি করা; আর সাংবাদিকতার লক্ষ্য হলো সব পক্ষের বক্তব্য, তথ্য ও বাস্তবতা যাচাই করে জনগণের সামনে নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করা। উদ্দেশ্য, ভূমিকা ও দায়বদ্ধতার দিক থেকে এই দুটি ক্ষেত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই সাংবাদিকতা পেশায় থেকে সক্রিয় দলীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা পেশাগত নৈতিকতা, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতি জনআস্থার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
সাংবাদিকতার প্রাণশক্তি হলো নিরপেক্ষতা, বস্তুনিষ্ঠতা, সত্যনিষ্ঠা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতা। একজন সাংবাদিকের প্রতিটি প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ কিংবা অনুসন্ধান পাঠক, দর্শক ও শ্রোতার কাছে তখনই গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, যখন তারা বিশ্বাস করেন যে সেখানে কোনো ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক পক্ষপাত কাজ করেনি। সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ বা প্রযুক্তি নয়—জনগণের আস্থা। একবার সেই আস্থা নষ্ট হয়ে গেলে তা পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন।
কিন্তু যখন কোনো সাংবাদিক একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী, নেতা বা পদধারী হিসেবে পরিচিত হন, তখন তার প্রকাশিত সংবাদ বা মতামত নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে। এমনকি তিনি নিরপেক্ষভাবে কাজ করলেও সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ থেকে যায়—তিনি কি সত্যিই নিরপেক্ষ, নাকি দলের স্বার্থ রক্ষার জন্য তথ্য উপস্থাপন করছেন? এই সন্দেহই সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়।
বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে সাংবাদিকদের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা পেশাগত নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। অনেক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম তাদের কর্মীদের রাজনৈতিক দলীয় পদ গ্রহণ, নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ, কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রকাশ্যে প্রচার চালানো কিংবা দলীয় কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে। কারণ, সংবাদকর্মীর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিশ্বাস থাকতে পারে, কিন্তু সেই বিশ্বাস যেন কখনো তার সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য যাচাই, বিশ্লেষণ কিংবা উপস্থাপনায় প্রভাব বিস্তার না করে। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা শুধু সরকারের প্রভাবমুক্ত থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাজনৈতিক দল, করপোরেট স্বার্থ এবং ব্যক্তিগত আনুগত্য থেকেও মুক্ত থাকার বিষয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিকদের মধ্যে রাজনৈতিক পরিচয়ভিত্তিক বিভাজন, দলীয় সমর্থনে সংগঠন গঠন কিংবা রাজনৈতিক আনুগত্যের অভিযোগ সামনে এসেছে। কোথাও কোথাও সংবাদকর্মীদের মূল্যায়নও তাদের পেশাগত দক্ষতার পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে করা হয়। এর ফলে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সাংবাদিক সমাজের মধ্যে বিভাজন বাড়ে এবং পেশাগত সংহতি দুর্বল হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ, যারা একটি নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের ওপর ভরসা করে সত্য জানতে চান।
একজন সাংবাদিক যখন একই সঙ্গে সক্রিয় রাজনীতিবিদ বা রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে ভূমিকা পালন করেন, তখন স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়া প্রায় অনিবার্য। তিনি কি দলের অবস্থানকে অগ্রাধিকার দেবেন, নাকি জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করবেন? তিনি কি দলের বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির তথ্য একই সাহস ও বস্তুনিষ্ঠতার সঙ্গে প্রকাশ করতে পারবেন? আবার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের সময় তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান কতটা প্রভাব ফেলবে? এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া কঠিন। কারণ, রাজনৈতিক আনুগত্য অনেক সময় সত্য প্রকাশের পথে অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক মেরুকরণ সংবাদমাধ্যমকেও বিভক্ত করেছে। ফলে একই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সামনে এসেছে এবং সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়েছেন। নিরপেক্ষ তথ্যের পরিবর্তে দলীয় প্রচারণা যখন সংবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করে, তখন গণতন্ত্র দুর্বল হয়। কারণ, গণতন্ত্র টিকে থাকে সচেতন নাগরিক সমাজের ওপর, আর সচেতন নাগরিক গড়ে ওঠে নির্ভুল ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে। সংবাদমাধ্যম যদি সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক কাঠামোও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে এটিও সত্য যে সাংবাদিকরাও এই সমাজের নাগরিক। সংবিধান প্রদত্ত অধিকার অনুযায়ী তাদেরও রাজনৈতিক মতামত, আদর্শ বা দর্শন থাকতে পারে। তারা রাষ্ট্রনীতি, নির্বাচন বা জাতীয় ইস্যু নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে চিন্তা করতে পারেন। কিন্তু সেই রাজনৈতিক বিশ্বাস ব্যক্তিগত পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। সক্রিয় দলীয় রাজনীতি, রাজনৈতিক পদ-পদবি গ্রহণ, নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ কিংবা কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃত্ব প্রদান সাংবাদিকতার পেশাগত নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ, একজন সাংবাদিকের প্রথম এবং প্রধান পরিচয় হওয়া উচিত—তিনি জনগণের প্রতিনিধি, কোনো রাজনৈতিক দলের নয়।
ডিজিটাল যুগে এই চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন সাংবাদিকদের জন্য যেমন তথ্য আদান-প্রদানের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, তেমনি এটি ব্যক্তিগত মত প্রকাশেরও একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম। অনেক সাংবাদিক প্রকাশ্যে রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে মন্তব্য করছেন, দলীয় প্রচারণামূলক পোস্ট শেয়ার করছেন, রাজনৈতিক বিতর্কে পক্ষ নিয়ে অংশ নিচ্ছেন কিংবা কোনো রাজনৈতিক নেতার প্রশংসা বা সমালোচনায় সরব হচ্ছেন। এতে তাদের সংবাদ পরিবেশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। পাঠকের কাছে তখন সংবাদ ও ব্যক্তিগত মতামতের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সাংবাদিকদের সংযম, দায়িত্বশীলতা এবং পেশাগত সচেতনতা অত্যন্ত প্রয়োজন।
এছাড়া রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ওপর। কোনো সাংবাদিক যদি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখেন, তাহলে সেই গোষ্ঠীর অনিয়ম, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে অনুসন্ধান পরিচালনা করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। আবার প্রতিপক্ষের বিষয়ে অতিরঞ্জিত বা একপেশে প্রতিবেদন প্রকাশের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। এতে সাংবাদিকতার মূল শক্তি—সত্য অনুসন্ধানের সাহস—দুর্বল হয়ে পড়ে।
সাংবাদিকতার স্বাধীনতা কেবল আইনগত স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়; এটি নৈতিক স্বাধীনতারও বিষয়। একজন সাংবাদিককে রাজনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক প্রভাব, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা দলীয় আনুগত্য—সব ধরনের প্রভাব থেকে নিজেকে যতটা সম্ভব মুক্ত রাখতে হয়। কারণ, সাংবাদিকের কলমের শক্তি তার স্বাধীনতায়, তার বিশ্বাসযোগ্যতায় এবং তার নৈতিক সাহসে।
পেশাদার সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, স্বার্থের সংঘাত এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে পেশাগত নৈতিকতা ও আচরণবিধি অনুসরণে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। তৃতীয়ত, সাংবাদিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার চর্চাকে উৎসাহিত করতে হবে। চতুর্থত, নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে যোগ্যতা, দক্ষতা ও পেশাগত সততাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের মালিকপক্ষ ও সম্পাদকীয় নীতিতেও স্বাধীনতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাংবাদিকদের নিজেদের মধ্যেই এই উপলব্ধি তৈরি হওয়া যে জনগণের আস্থা অর্জনই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। রাজনৈতিক পরিচয় সাময়িক সুবিধা এনে দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয় গড়ে ওঠে তার সততা, নিরপেক্ষতা, সাহস এবং সত্য প্রকাশের ধারাবাহিকতার মাধ্যমে।
সাংবাদিকতা এবং রাজনীতি—উভয়ই রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য অপরিহার্য। একটি গণতন্ত্রে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম। কিন্তু এই দুই ভূমিকাকে একই ব্যক্তির মধ্যে সক্রিয়ভাবে একত্রিত করার চেষ্টা প্রায়ই পেশাগত সংকট, স্বার্থের সংঘাত এবং বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি সৃষ্টি করে। একজন রাজনীতিকের দায়িত্ব একটি নির্দিষ্ট আদর্শ বা দলের পক্ষে অবস্থান নেওয়া, আর একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব সব পক্ষের বক্তব্য যাচাই করে সত্যের অনুসন্ধান করা। এই দুটি দায়িত্বের মৌলিক পার্থক্য অনুধাবন করাই পেশাদার সাংবাদিকতার পূর্বশর্ত।
একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত তার স্বাধীন কলম, তথ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা, নৈতিক সাহস এবং জনস্বার্থে সত্য প্রকাশের অঙ্গীকার। দলীয় পতাকা নয়, জনগণের আস্থাই একজন সাংবাদিকের প্রকৃত শক্তি। আর সেই আস্থা অর্জনের একমাত্র পথ হলো পেশাগত সততা, বস্তুনিষ্ঠতা, নিরপেক্ষতা এবং সত্যের প্রতি আপসহীন দায়বদ্ধতা।
লেখক : মুহা: আব্দুল আউয়াল, সভাপতি, রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়ন (আরইউজে)।
e-mail: awal.raj.diganta@gmail.com

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল সময়ের কথা ২৪ লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন somoyerkotha24news@gmail.com ঠিকানায়।