স্টাফ রিপোর্টার : নির্যাতন প্রতিরোধ শুধু আইন প্রণয়নের বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তি। ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি নির্যাতনবিরোধী আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও এর অপশনাল প্রোটোকলের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মীরা। শুক্রবার (২৬ জুন) সকালে রাজশাহী নগরীর অলকার মোড়ে চেম্বার ভবনের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তারা এসব কথা বলেন।
২৬ জুন নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সমর্থনে আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার রাজশাহী জেলা ও মহানগর শাখার উদ্যোগে শুক্রবার (২৬ জুন) সকাল সাড়ে ১০টায় নগরীর অলকার মোড়ে চেম্বার ভবনের সামনে এক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে রাজশাহীর শতাধিক সাংবাদিক, সামাজিক ও মানবাধিকারকর্মী, বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং অধিকার-এর জেলা ও মহানগর শাখার কর্মীরা অংশ নেন। এছাড়া বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরাও মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকার-এর রাজশাহী সমন্বয়ক ও সাংবাদিক মঈন উদ্দিনের সভাপতিত্বে এবং সংগঠনের কর্মী হাবিবুল্লাহ মোহাম্মদ কাওসারীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বক্তব্য দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ও সমাজকর্মী ইফতিখারুল আলম মাসঊদ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে)-এর সহকারী মহাসচিব ড. সাদিকুল ইসলাম স্বপন, রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ডালিম হোসেন শান্ত, মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিক মাসুদ রানা রাব্বানী, মানবাধিকার সংগঠন অধিকার’ বিবৃতি পাঠ করেন মানবাধিকার কর্মী সানজিদা ইসলাম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, দৈনিক বাংলার বিবেকের সম্পাদক ও প্রকাশক আবু হেনা মোস্তফা জামান, ফটো সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী আসাদুজ্জামান আসাদ, মানবাধিকার কর্মী রাজনৈতিক বিশ্লেষক আনোয়ার হোসেন, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক এম শামীম, মানবাধিকার কর্মী হুজাইফা, মানবাধিকার জুল ইকরাম ইবতিদা, উষা, সানজিদা ইসলাম, মানবাধিকার কর্মী মাহমুদ হাসান, মানবাধিকার কর্মী আতিকুর রহমান আশা প্রমূখ ।
এ সময় বক্তারা বলেন, ১৯৮৪ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক ও মর্যাদাহানিকর আচরণের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সনদ গ্রহণ করে। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালের ২৬ জুন এটি কার্যকর হয় এবং জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিবছর ২৬ জুন আন্তর্জাতিকভাবে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সমর্থনে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
তারা বলেন, বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালের ৫ অক্টোবর নির্যাতনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ প্রণীত কনভেনশনে অনুস্বাক্ষর করে। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে ‘নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন’ প্রণীত হলেও বাস্তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের দায়মুক্তি এবং জবাবদিহিতার অভাবে নির্যাতন বন্ধ হয়নি। বিশেষ করে শেখ হাসিনার শাসনামলে বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, ভিন্নমতাবলম্বী ও সাধারণ নাগরিকদের গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন এবং বিচারিক হয়রানির শিকার হতে হয়েছে বলে বক্তারা অভিযোগ করেন।
বক্তারা আরও বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর দমন-পীড়ন ও নির্যাতনের ঘটনা দেশের মানুষের কাছে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। পরবর্তীতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের লক্ষ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ জারি করলেও পরবর্তীতে সেসবের মধ্যে ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ সংসদে বিল আকারে উত্থাপন না হওয়ায় বাতিল হয়ে যায়।
মানববন্ধনে বক্তারা দাবি করেন, এসব অধ্যাদেশ বাতিলের ফলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তারা এটিকে ভুক্তভোগী পরিবার ও সাধারণ জনগণের প্রতি অন্যায় এবং গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী বলে অভিহিত করেন।
বক্তারা বলেন, নির্যাতন প্রতিরোধে শুধু আইন করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জবাবদিহিতামূলক শাসনব্যবস্থা। ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে।
মানববন্ধন থেকে বর্তমান সরকারের প্রতি বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া, বাতিল হওয়া গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলোর আলোকে কার্যকর আইন প্রণয়ন করে জাতীয় সংসদে পাস করা, একটি স্বাধীন ও কার্যকর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও এর অপশনাল প্রোটোকলের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়।
শেষে নির্যাতনের শিকার সকল ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে মানবাধিকার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা। #
