নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

বাংলাদেশ রবিবার। রাত ৪:৩৬। ৩১ মে, ২০২৬।

ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিচ্ছে পাকিস্তান!

মে ৩১, ২০২৬ ৩:২৫ 👁️ ৩৩ views
Link Copied!

অনলাইন ডেস্ক :দশকের পর দশক ধরে পাকিস্তানি পাসপোর্টে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ বাক্য লেখা থাকত—‘ইসরায়েল ছাড়া বিশ্বের সব দেশের জন্য বৈধ।’ এই অবস্থান কেবল একটি কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের অন্যতম মৌলিক পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে পাকিস্তান ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি এবং এখনো সেই অবস্থানে অটল রয়েছে।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এ নীতির ভিত্তি গড়ে ওঠে। গভীর ধর্মীয় অনুভূতি, ফিলিস্তিন প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য, সংবেদনশীল গণমাধ্যম পরিবেশ এবং ধারাবাহিক সরকারগুলোর নীতিগত অবস্থান এ অবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে। তবে বর্তমানে এই দীর্ঘস্থায়ী নীতি নতুন এক আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
ট্রাম্পের প্রস্তাব ও পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির আলোচনার সঙ্গে আব্রাহাম চুক্তির সম্প্রসারণকে যুক্ত করার প্রস্তাব দেন। তাঁর দাবি, সৌদি আরব, কাতার, পাকিস্তান ও তুরস্কসহ আরও কয়েকটি দেশকে একযোগে আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দিতে হবে, যাতে মধ্যপ্রাচ্যে একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করা যায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, এটি শুরু হওয়া উচিত সৌদি আরব ও কাতারের তাৎক্ষণিক স্বাক্ষরের মাধ্যমে, এরপর অন্য সবাইকে একই পথ অনুসরণ করতে হবে।

তবে ইসলামাবাদ দ্রুত এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। ২৬ মে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মোহাম্মদ আসিফ বলেন, পাকিস্তান এমন কোনো ব্যবস্থার অংশ হতে পারে না, যা তার “মৌলিক আদর্শের” সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি জানান, এ বিষয়ে পাকিস্তান কোনো উদ্যোগ নেয়নি এবং তাদের কাছে এ ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিক অনুরোধও আসেনি।

আরও পড়ুনঃ  ঈদে রাজশাহীর নিরাপত্তায় সতর্ক র‌্যাব

এই ঘটনার পর পাকিস্তানে দীর্ঘদিন ধরে চলমান একটি প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে—ইসলামাবাদ কি কখনো ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবে, আর দিলে কোন পরিস্থিতিতে?
কেন ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় না পাকিস্তান

রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে পাকিস্তানের অবস্থান প্রায় অপরিবর্তিত। দেশটির বেসামরিক ও সামরিক—উভয় ধরনের সরকারই বলে এসেছে, ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার পূর্বশর্ত হলো ১৯৬৭ সালের পূর্ববর্তী সীমান্তের ভিত্তিতে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, যার রাজধানী হবে পূর্ব জেরুজালেম।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বারবার এ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তাঁদের মতে, কোনো দেশ আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেবে কি না, সেটি তাদের নিজস্ব বিষয়; তবে পাকিস্তান ফিলিস্তিন প্রশ্নকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে।

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের এই অবস্থান কেবল কূটনৈতিক নয়; বরং এটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। জনমত, ইসলামপন্থী দল, সংসদ, নাগরিক সমাজ এবং সক্রিয় গণমাধ্যম—সবাই এই প্রশ্নে প্রভাব বিস্তার করে।

পাকিস্তানের এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকের ভাষায়, ফিলিস্তিনি আন্দোলন পরিত্যাগ করেছে—এমন ধারণা তৈরি হলে যেকোনো সরকার ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও জনগণের একটি বড় অংশের তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়বে।
কাশ্মীর ইস্যুর প্রভাব

ফিলিস্তিন প্রশ্নে পাকিস্তানের অবস্থান কাশ্মীর ইস্যুর সঙ্গেও সম্পর্কিত। দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানি নীতিনির্ধারকেরা ফিলিস্তিনি ও কাশ্মীরি জনগণের সংগ্রামের মধ্যে সাদৃশ্য তুলে ধরেছেন। উভয় বিষয়কেই তারা আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছে।

আরও পড়ুনঃ  লালপুরে ড্যাবের উদ্যোগে ফ্রি স্বাস্থ্য সেবা ও ওষুধ বিতরণ

বিশ্লেষকদের মতে, ফিলিস্তিন প্রশ্নের সমাধান ছাড়াই ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিলে পাকিস্তান নীতিগত অসঙ্গতির অভিযোগের মুখে পড়তে পারে এবং তাদের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
ওয়াশিংটনের চাপ ও কূটনৈতিক ভারসাম্য

ট্রাম্পের সাম্প্রতিক প্রস্তাবকে অনেকেই মধ্যপ্রাচ্য কূটনীতির নতুন রূপ হিসেবে দেখছেন। তাঁর প্রথম মেয়াদের অন্যতম বড় কূটনৈতিক অর্জন ছিল আব্রাহাম চুক্তি, যার মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদান ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে।

মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামও প্রকাশ্যে সৌদি আরব, কাতার ও পাকিস্তানকে আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এ পথে না গেলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তবে পাকিস্তানের জন্য বিষয়টি সহজ নয়। ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিলে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক জটিল হতে পারে, দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সৌদি আরবের ভূমিকা

বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে পাকিস্তানের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন এলে তা অনেকাংশে সৌদি আরবের অবস্থানের ওপর নির্ভর করবে। সৌদি আরব পাকিস্তানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।

তবে সৌদি আরব এখনো বলছে, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ অবশ্যই একটি বিশ্বাসযোগ্য দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে। এই অবস্থান মূলত পাকিস্তানের বর্তমান নীতির সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
গাজা যুদ্ধের প্রভাব

আরও পড়ুনঃ  শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী কাল

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং পরবর্তী সময়ে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বদলে দেয়। এর আগে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছিল। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেই প্রক্রিয়া কার্যত স্থগিত হয়ে যায়।

গাজায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের কারণে মুসলিম বিশ্বে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পক্ষে জনসমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। পাকিস্তানেও একই চিত্র দেখা যায়।

গ্যালাপ পাকিস্তানের এক জরিপে দেখা যায়, ৯১ শতাংশ পাকিস্তানি গাজার ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন, যেখানে মাত্র ২ শতাংশ ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছেন।

ধর্মীয় সংগঠন, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, একটি কার্যকর ও স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে না।
অবস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনা কতটা?

বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তান তার অবস্থান পরিবর্তন করবে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে নানা পরিবর্তন এলেও সাত দশকের বেশি সময় ধরে বজায় থাকা পাকিস্তানের এই ‘রেডলাইন’ এখনো অটুট রয়েছে।

ট্রাম্পের সম্প্রসারিত আব্রাহাম চুক্তি উদ্যোগ নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিলেও ইসলামাবাদের বর্তমান অবস্থান স্পষ্ট—স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রশ্নে কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই।

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল সময়ের কথা ২৪ লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন somoyerkotha24news@gmail.com ঠিকানায়।