স্টাফ রিপোর্টার : পদ্মার চরাঞ্চলে চিকিৎসাসেবা, যোগাযোগব্যবস্থা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় নানা সংকটের কথা তুলে ধরেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের চরখিদিরপুর এলাকায় আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব সমস্যা তুলে ধরা হলে তা সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম। একই সঙ্গে সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ বা পুশ-ইন ঠেকাতে স্থানীয় জনগণকে সতর্ক ও সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।
সোমবার (১৫ জুন) বিকেলে চরখিদিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মসূচি ও সীমান্ত সুরক্ষা বিষয়ক এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইবনুল আবেদীন এর সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, সীমান্তে পুশ-ইন একটি বেআইনি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোনো দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী জোরপূর্বক বা কৌশলে অন্য দেশের নাগরিকদের সীমান্ত অতিক্রম করিয়ে দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন সীমান্তে এমন অপচেষ্টার ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও স্থানীয় জনগণের সতর্ক অবস্থানের কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব চেষ্টা প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্ব শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নয়, সাধারণ মানুষেরও। সীমান্ত এলাকায় কোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশের ঘটনা যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।
সভায় চরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির কথাও উঠে আসে। চরখানপুর এলাকার বাসিন্দা কমর আলী বলেন, প্রায় সাড়ে তিন হাজার ভোটারের এই এলাকায় কোনো কমিউনিটি ক্লিনিক বা চিকিৎসাকেন্দ্র নেই। চিকিৎসার জন্য প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে হয়। এতে গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষ সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন। তিনি এলাকায় দ্রুত একটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের দাবি জানান।
হরিয়ান ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবু জাফর প্রমিজ বলেন, রাজশাহী শহরের কাছাকাছি অবস্থান হলেও চরাঞ্চলের মানুষ এখনো অনেক মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতা এখানকার মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা। বর্ষা ও বন্যার সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, ইউনিয়নের দুটি ওয়ার্ডে সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ জরুরি। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সোলার সড়কবাতি স্থাপন এবং বন্যার সময় গবাদিপশু রক্ষার জন্য উঁচু আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ প্রয়োজন। সাম্প্রতিক সময়ে এলাকায় রাসেলস ভাইপারের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় জননিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
জেলা প্রশাসক তাঁর বক্তব্যে সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ড, নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। দারিদ্র্য বিমোচন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসব সেবার সুফল মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াই প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব।
মহান মুক্তিযুদ্ধের ত্যাগ ও অর্জনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। দেশের কল্যাণে নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করারও আহ্বান জানান তিনি।
এলাকাটিতে এটিই তাঁর প্রথম সফর উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, চরাঞ্চলের মানুষের সমস্যাগুলো তিনি সরাসরি দেখেছেন ও শুনেছেন। ভবিষ্যতেও তিনি এ এলাকায় এসে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবেন।
সভায় রাজশাহী ব্যাটালিয়ন (১ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রিয়াজ শাহরিয়ার সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের আরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশে নাগরিকত্বসংক্রান্ত নতুন আইন কার্যকর হওয়ার পর সীমান্ত এলাকায় কিছুটা অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই স্থানীয় জনগণকে বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করে সজাগ থাকতে হবে।
তিনি জানান, কয়েক দিন আগে রাজশাহী সীমান্ত এলাকায় অবৈধ অনুপ্রবেশের একটি অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। তবে স্থানীয় গ্রামবাসীর তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ এবং বিজিবির তৎপরতায় সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ভবিষ্যতেও এমন কোনো অপচেষ্টা যাতে সফল না হয়, সে জন্য সবাইকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. মহিনুল হাসান, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ মেহেদী হাসান, হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পবা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সুলতান আহমেদসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
