মুহা: আব্দুল আউয়াল : সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি সমাজের বিবেক, গণতন্ত্রের প্রহরী এবং জনগণের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কিংবা ক্ষমতার বিভিন্ন কেন্দ্রের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনগণকে অবহিত রাখার দায়িত্ব সাংবাদিকদের ওপর ন্যস্ত। কিন্তু এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হলে সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হতে হবে পেশাদারিত্ব। কারণ পেশাদারিত্বহীন সাংবাদিকতা শুধু গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাই নষ্ট করে না, বরং সমাজে বিভ্রান্তি, অবিশ্বাস ও অস্থিরতারও জন্ম দেয়।
বর্তমান বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তির অভূতপূর্ব বিকাশের ফলে তথ্যের প্রবাহ যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে অপতথ্য, গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে যে কেউ তথ্য প্রচার করতে পারলেও সাংবাদিকের কাজ হলো যাচাই-বাছাই করে সত্য তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা। এই জায়গাতেই পেশাদার সাংবাদিকতা অন্য সব তথ্যপ্রবাহ থেকে আলাদা হয়ে ওঠে। একজন পেশাদার সাংবাদিক কখনো আবেগ, ব্যক্তিগত পক্ষপাত কিংবা কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থকে প্রাধান্য দেন না; তিনি সত্য, নিরপেক্ষতা ও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেন।
পেশাদারিত্বের অন্যতম শর্ত হলো নৈতিকতা। সাংবাদিকতার নীতিমালা স্পষ্টভাবে বলে, কোনো সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই করতে হবে, উভয় পক্ষের বক্তব্য নিতে হবে এবং সংবাদে ব্যক্তিগত মতামত বা পক্ষপাতের প্রভাব এড়াতে হবে। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়, কখনো কখনো প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার তাড়নায় বা অন্য কোনো কারণে যাচাইবিহীন তথ্য প্রকাশিত হয়, যা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সমাজের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। ফলে গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। তাই সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় নৈতিকতা ও পেশাদারিত্বের বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকতার পেশাদারিত্বের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে গণমাধ্যম খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং পেশাগত মানোন্নয়নের ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে অনেক সাংবাদিক সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে কাজ করেন। অনেক ক্ষেত্রে কম বেতন, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা ও মানসম্মত কাজের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে। এসব সমস্যা দূর না হলে পেশাদার সাংবাদিকতা আরও শক্তিশালী হবে না।
পেশাদারিত্বের সঙ্গে সাংবাদিকদের জবাবদিহিতার সম্পর্কও গভীর। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি দায়িত্বশীলতাও জরুরি। সাংবাদিকের ভুল হতে পারে, কিন্তু সেই ভুল সংশোধনের মানসিকতা থাকতে হবে। পাঠক, দর্শক ও শ্রোতাদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। একটি দায়িত্বশীল গণমাধ্যম ভুল তথ্য প্রকাশ করলে তা সংশোধন করে এবং প্রয়োজন হলে ক্ষমা চায়। এটিই পেশাদার আচরণের অংশ।
ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকতার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অ্যালগরিদম-নির্ভর তথ্যপ্রবাহ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব সংবাদ পরিবেশনের ধরন বদলে দিয়েছে। এখন শুধু দ্রুত সংবাদ প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়; তথ্যের সত্যতা যাচাই, প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা এবং গভীর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ফলে আধুনিক সাংবাদিকদের প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি তথ্য বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানী সক্ষমতাও অর্জন করতে হবে।
পেশাদার সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্য, নৈতিক মানদণ্ড অনুসরণ, প্রশিক্ষণের সুযোগ বৃদ্ধি এবং পেশাগত স্বার্থ রক্ষায় সংগঠনগুলোকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে গণমাধ্যম মালিক, রাষ্ট্র এবং সমাজকেও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাংবাদিকরা নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। স্থানীয় সমস্যা, উন্নয়ন, পরিবেশ, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জনদুর্ভোগের মতো বিষয়গুলো তুলে ধরে তারা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ তৈরি করছেন। তবে এই ভূমিকা আরও কার্যকর করতে হলে সাংবাদিকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং নৈতিক মানদণ্ড অনুসরণের ওপর জোর দিতে হবে।
সাংবাদিকতার মূল শক্তি জনগণের আস্থা। আর এই আস্থা অর্জন ও ধরে রাখার একমাত্র পথ হলো পেশাদারিত্ব। ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে সত্য ও জনস্বার্থের পক্ষে দাঁড়াতে পারলেই সাংবাদিকতা তার প্রকৃত মর্যাদা লাভ করবে। তাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো দক্ষ, দায়িত্বশীল, নৈতিক এবং পেশাদার সাংবাদিকতার চর্চা। কারণ শক্তিশালী গণমাধ্যম ছাড়া যেমন গণতন্ত্র সুসংহত হতে পারে না, তেমনি পেশাদারিত্ব ছাড়া শক্তিশালী গণমাধ্যমও গড়ে ওঠে না। সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ, গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং জনগণের তথ্য অধিকার—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে পেশাদারিত্ব।
সাংবাদিকতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জনগণের আস্থা অর্জন ও ধরে রাখার ক্ষেত্রে পেশাদারিত্বই সবসময় সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। একটি সংবাদমাধ্যমের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বা প্রচারসংখ্যার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার বিশ্বাসযোগ্যতা। আর এই বিশ্বাসযোগ্যতার ভিত্তি গড়ে ওঠে তথ্য যাচাই, নিরপেক্ষতা, নৈতিকতা এবং দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে।
পেশাদার সাংবাদিকতা কখনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হতে পারে না। এর মূল লক্ষ্য জনস্বার্থ সংরক্ষণ, সত্য উদঘাটন এবং ক্ষমতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। একজন পেশাদার সাংবাদিক তাই কেবল সংবাদ পরিবেশন করেন না, বরং সমাজে স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
একই সঙ্গে পেশাদারিত্ব সাংবাদিকদের জন্য অব্যাহত শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নেরও দাবি জানায়। দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রবাহের এই যুগে নতুন দক্ষতা অর্জন, তথ্য যাচাইয়ের আধুনিক কৌশল ব্যবহার এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা একজন সাংবাদিকের পেশাগত সক্ষমতার অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে।
সাংবাদিকতার প্রাণ পেশাদারিত্ব—এই কথার তাৎপর্য এখানেই যে, পেশাদারিত্বই একজন সাংবাদিককে ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক কিংবা গোষ্ঠীগত প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে সত্য ও জনস্বার্থের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার শক্তি দেয়। গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা ও সম্মান ধরে রাখতে হলে পেশাদার সাংবাদিকতার চর্চার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : মুহা: আব্দুল আউয়াল, সভাপতি, রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়ন (আরইউজে)। e-mail: awal.raj.diganta@gmail.com
