অনলাইন ডেস্ক : ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে করা এক মন্তব্যের জেরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে এফআইর দায়ের হয়েছে। উসকানিমূলক মন্তব্যের দায়ে বৃহস্পতিবার পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি সাইবার ক্রাইম থানায় ওই অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
এর আগে, গত মঙ্গলবার (২ জুন) এক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘‘বাংলাদেশে কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন, সবটাই জানি।’’ সেদিন কলকাতার রানি রাসমণি রোডের জনসভায় শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ঘাতকদের গ্রেপ্তার নিয়ে ওই মন্তব্য করেন তিনি।
দেশটির সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, কলকাতার আইনজীবী রিঙ্কি সিং চট্টোপাধ্যায় মমতার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগে তিনি বলেছেন, গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশে খুন হন শরিফ ওসমান বিন হাদি। হত্যাকারীরা গত জানুয়ারিতে মেঘালয় সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে পাড়ি জমান। পরে কলকাতা পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স দুই সন্দেহভাজন ঘাতককে গ্রেপ্তার করে।
এরপর এই নিয়ে ২ জুনের জনসভায় দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর কাছে থেকে ফোন পাওয়ার কথা জানিয়ে মমতা বলেন, অন্য দেশে খুন হলেও কারা জড়িত তিনি জানেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেব ইঙ্গিত করে তার ওই মন্তব্যে দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করেছেন আইনজীবী রিঙ্কি সিং। সেই কারণে শিলিগুড়ি থানায় মমতার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছেন এই আইনজীবী।
রিঙ্কি বলেন, ‘‘তিনি (মমতা) মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের যাই কথা হোক, সেটা এখন বাংলাদেশের একটা হত্যাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সংগঠিত হত্যা বলে চালাচ্ছেন। বাংলাদেশ ও ভারতের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করলেন। বিশ্বদরবারে ভারতের মাথা নত করলেন। বাংলাদেশের হিন্দুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করলেন। পদে আসার সময় শপথ নিয়েছিলেন যে তিনি দেশের গোপনীয়তা বজায় রাখবেন। যেই না পদ চলে গেছে অমনি তিনি মৌলবাদীদের উস্কে দিলেন।’’
জনসভায় মমতা বলেছিলেন, ‘‘বাংলাদেশ থেকে একটা বড় খুনিকে এসটিএফ গ্রেপ্তার করেছিল। যা নিয়ে বাংলাদেশে বড় বিক্ষোভ হয়েছিল। অন্যদেশের কথা বলছি না, আমি যে পয়েন্ট বলছি ওরা মেঘালয় দিয়ে বাংলায় আসে। এখানে আসার পর আমাদের এসটিএফ ধরে। হোম মিনিস্টার নিজে বলছেন… এতদিন বলিনি আজ অত্যাচারের শেষ সীমায় গেছে বলে বললাম।’’
‘‘তিনি (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) বললেন… আপনি বাংলার পুলিশকে বলে দিন এই কথা বাইরে যেন না বলে। এটা দেশের জন্য। কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন, কার কার নাম বেরিয়েছিল… আমি সব জানি। আমার হৃদয় সত্য ভান্ডার।’’
• মমতার বিরুদ্ধে যেসব ধারায় অভিযোগ
১৫২- দেওয়ানি কার্যবিধি
১৫৩-দাঙ্গা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে উস্কানি, জাতি ও ধর্মের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়ানো
১৫৩ এ- ধর্ম, জাতি, ভাষা, বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা, হিংসা, বা ঘৃণা ছড়ানো
১৯১ ও ১৯২ ধারা- দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা
১৯৬ ধারা-ধর্ম,বর্ণ,ভাষা বা অঞ্চলের ভিত্তিতে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা বা বিদ্বেষ ছড়ানো এবং জনসম্প্রীতি বিনষ্ট করলে
৩৫১- কোনও ব্যক্তিকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে বা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কাজ করতে বাধ্য করার চেষ্টা
৩৫২-ইচ্ছাকৃত ভাবে শান্তি ভঙ্গ করার উদ্দেশ্য
• হাদি হত্যাকাণ্ড ও মামলা
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি। এজন্য প্রায় এক বছর আগে থেকে শুরু করেছিলেন অভিনব প্রচারণা। এর মধ্যেই গত বছরের ১২ ডিসেম্বর শরিফ ওসমান হাদিকে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে গুলি করে মোটরসাইকেল আরোহী দুর্বৃত্তরা।
মাথায় গুলিবিদ্ধ হাদি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাতে মারা যান। হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে পল্টন থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে ১২০(বি)/৩২৬/৩০৭/১০৯/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। হাদির মৃত্যুর পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।
এ বছরের ৬ জানুয়ারি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৭ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন। ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ থেকে হাদিকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে এতে উল্লেখ করা হয়।
ডিবির দেওয়া চার্জশিটভুক্ত আসামিরা হলেন, প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ (৩৭) ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেন (২৬), তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী (৪৩), ফিলিপ স্নাল (৩২), মুক্তি মাহমুদ (৫১), জেসমিন আক্তার (৪২), হুমায়ুন কবির (৭০), হাসি বেগম (৬০), সাহেদা পারভীন সামিয়া (২৪), ওয়াহিদ আহমেদ শিপু (২৭), মারিয়া আক্তার লিমা (২১), কবির (৩৩), নুরুজ্জামান ওরফে উজ্জ্বল (৩৪), সিবিয়ন দিও (৩২), সঞ্জয় চিসিম (২৩), আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু (৩৭) ও ফয়সাল (২৫)।
চার্জশিটে অসন্তোষ প্রকাশ করে ১৫ জানুয়ারি আদালতে নারাজি আবেদন করেন মামলার বাদী। আদালত আবেদনটি গ্রহণ করে অধিকতর তদন্তের জন্য মামলাটি সিআইডির কাছে হস্তান্তরের আদেশ দেন।
ডিবির দাখিল করা চার্জশিটভুক্ত ১৭ আসামির মধ্যে ১১ জন বর্তমানে কারাগারে আছেন। বাকি ৬ জন পলাতক। পলাতক আসামিরা হলেন, প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ, তার সহযোগী আলমগীর হোসেন, রাজধানীর মিরপুরের সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, ফিলিপ স্নাল, মুক্তি আক্তার এবং ফয়সালের বোন জেসমিন আক্তার।
