স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) এক কথিত ছাত্রলীগ কর্মীকে কেন্দ্র করে দিনভর নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। প্রক্টরের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগে ওই ব্যক্তিকে শিক্ষার্থীদের মারধরের পর পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। এর কিছুক্ষণ পরই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) ভবনে হামলার ঘটনায় রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার ও তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক নাজমুস সাকিব আহত হন। পরে অভিযুক্তদের ‘সেইফ এক্সিট’ দেওয়ার অভিযোগ তুলে প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন রাকসু ও হল সংসদের নেতারা। শেষ পর্যন্ত উপাচার্যের তদন্ত কমিটি গঠন ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রক্টর দপ্তর, রাকসু ভবন, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার এলাকা এবং প্রশাসনিক ভবনকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সংস্কৃত বিভাগের এক নারী শিক্ষার্থীর অভিযোগের বিষয়ে আলোচনা করতে সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী এবং বর্তমানে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত আনাস প্রক্টর দপ্তরে যান। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবর রহমানের সঙ্গে তার বাকবিতণ্ডা হয়। পরে একই বিষয়ে মহসিন আলমকে ডাকা হলে আনাস আবারও প্রক্টর দপ্তরে উপস্থিত হন। একপর্যায়ে রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারের সঙ্গে তার উত্তপ্ত বাকবিনিময় হয়, যা পরে হাতাহাতিতে রূপ নেয়।
এ সময় প্রক্টরের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ ওঠে আনাসের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে তাকে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের কর্মী বলে দাবি করা হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। তবে ঘটনাস্থলে ঠিক কী ঘটেছিল এবং মারধরের পেছনের পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে।
প্রক্টর দপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে আনাসকে আটক করতে পুলিশ এলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ডিসিপ্লিনারি কমিটির মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করা হয়।
এর কিছু সময় পর আনাস কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে রাকসু ভবনে গিয়ে হামলা চালান বলে অভিযোগ করেন রাকসু নেতারা। তাদের দাবি, রাকসু ভবনে ঢুকে জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। হামলায় তাকে রক্ষা করতে গেলে রাকসুর তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক নাজমুস সাকিবও আহত হন।
হামলার পর উভয় পক্ষ কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার এলাকায় মুখোমুখি অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে আনাস ও তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন গ্রন্থাগারের রিডিং রুমে আশ্রয় নেন। সেখানে ঢুকে তাদের মারধরের অভিযোগও উঠেছে। পরে আহত এক সাবেক ছাত্রলীগ নেতাকে হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও বাধা ও হামলার চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের হস্তক্ষেপে তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এসব ঘটনার পর রাকসু ও হল সংসদের নেতারা অভিযোগ করেন, হামলার সঙ্গে জড়িতদের নিরাপদে ক্যাম্পাস ত্যাগের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এ অভিযোগ তুলে তারা প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
আহত রাকসুর তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক নাজমুস সাকিব বলেন, “আনাস প্রক্টর অফিস থেকে বের হয়ে কয়েকজনকে নিয়ে রাকসু ভবনে আসে। পরে জিএসের কক্ষে গিয়ে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে আম্মারের ওপর হামলা চালানো হয়। এরপর তারা লাইব্রেরির দিকে চলে যায়। পরে তাদের সেইফ এক্সিট দেওয়া হয়েছে।”
তবে ‘সেইফ এক্সিট’ দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবর রহমান বলেন, “ক্যাম্পাসের পরিবেশ স্বাভাবিক ও শান্ত রাখতে পুলিশ কাজ করছে। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না।”
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পরে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলামের সঙ্গে রাকসু, হল সংসদ ও সংশ্লিষ্ট ছাত্রনেতাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপ-উপাচার্য (শিক্ষা), উপ-উপাচার্য (প্রশাসন), ছাত্র উপদেষ্টা, প্রক্টর এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে উপাচার্য বলেন, “ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে দ্রুত ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হবে। পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত পরিচালনা করা হবে। তদন্তে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি ও দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, ক্যাম্পাসে সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে হামলার ঘটনায় কারা জড়িত এবং প্রকৃত ঘটনা কী—তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে একাধিক বিষয়ে ভিন্নতা থাকায় তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে প্রশাসন ও পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে, একই দিনে ধারাবাহিক সহিংস ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীরা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং ক্যাম্পাসে স্থায়ী শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। #
